তুল্য রোধ – প্রথম পাঠ

তুল্য রোধ – প্রথম পাঠ

স্কুল আর কলেজ ফিজিক্সের অন্যতম অংশ চল তড়িৎ এর অধ্যায় গুলো। আর তার মধ্যে সম্ভবত রোধের সমবায় থেকে তুল্য রোধ নির্ণয়ের অংক আরেক চিমটি বেশি অন্যতম 😛

ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলব যে শুরুর দিকে,  মানে ক্লাস ১০ এ যখন প্রথম  ( ১০ এই তো?  নাকি ৯ এ :-/ )   এইসব অংক  দেখি তখন যথেষ্ট মাত্রায় ঝামেলা লাগত এই গুলা। তারপর কলেজে উঠে আস্তে আস্তে তালবেতালের সার্কিট দেখতে দেখতে    এগুলা মোটামুটি হাতে চলে আসে। তারপরও এখনও  অনেক ” শৈল্পিক সার্কিট ” দেখলে মাথায় হাত দিয়ে বসে যেতে  ইচ্ছে করে -_-

শ্রেণি / সমান্তরালের সংজ্ঞা তো সবাই জানি,  পাঠ্যবইয়ে আছে। সেখানে রোধের ২ প্রান্তকে রেফারেন্স ধরে এই ২ বিন্যাস এর সংজ্ঞা দেয়া হয়। আর এই প্রান্ত গুলোকে বিবেচনায় নিয়েই আমরা তুল্য রোধ বের করার কাজটা করি। মোটামুটি সহজই একটা কথা। তাহলে ঝামেলা লাগে কেন?  সম্ভবত অপ্রতুল উদাহরণ আর বই গুলোতে ধুমধাম ব্যাখা ছাড়াই অংক করে দেয়া একটা কারণ। তাই এইখানে আমাদের এপ্রোচ হবে অনেক রকমের সমবায় দেখা আর সেগুলা কি সমবায়, কেন এই রকম সমবায়,  কিভাবে সমাধান করা যায় সেইটার উপর চোখ রেখে আগানো।

শ্রেণি সমবায় : কয়েকটা রোধ,  সিমপ্লি তারা একটার  পর আরেকটা  লাগানো।

সমান্তরাল সমবায় : কয়েকটা রোধ, তাদের সবার একদিকের প্রান্ত গুলা একসাথে লাগানো, অন্য  প্রান্তটা অন্যদিকে একসাথে লাগানো।

 

IMG_20140827_225655                     IMG_20140827_225803

 

কিছু সারাংশ জাতীয় কথা বলি।

১। তুল্য রোধ বসানোর সময় আগে ও পরের ভোল্টেজ আর কারেন্ট এর মান যেন একই থাকে সেটা ঠিক রাখা হয়।

২। শ্রেণি সংযোগে রোধ গুলোর মধ্য দিয়ে কারেন্টের মান একই থাকে,  বিভবের মান ভিন্ন হয় ।

শ্রেণি সংযোগে  রোধ গুলোতে বিভবের মান ভিন্ন হয় এর অর্থ হচ্ছে যে এই রোধ গুলোর মধ্য দিয়ে কারেন্ট পাস করার জন্য পৃথকভাবে কিছু কাজ করতে হচ্ছে ।  এই কাজের সমান ভোল্টেজ ড্রপ হচ্ছে প্রতি রোধে।  তাই ব্যাটারি থেকে শুরু করে সার্কিটে চলার পথে যত রোধ পড়বে,  সব গুলোতে  কিছু পরিমাণে বিভব কমতে থাকবে ,  তাই রোধ গুলোর ২ প্রান্তে বিভবের মানও ভিন্ন হবে।

এ কারণেই কিন্তু সার্কিটের যেকোন ২ প্রান্তের মাঝে যত গুলো রোধ থাকে তাদের  individual বিভবের মান যোগ করলেই সার্কিটে মোট  বিভবের মান পাওয়া যায় ।

এই পয়েন্টে কি লিখলাম কিছু কি বোঝা গেল?

:-/   না হইলে আবার পড়  ,   শ্রেণিতে থাকা রোধ গুলোর বিভব হিসেব করার জন্য সবসময় লম্বা চওড়া ক্যাল্কুলেশন লাগে না। ৩ নাম্বার পয়েন্ট টা মাথায় থাকলেই মুখে মুখে কিছু কাজ করে ফেলা যায়।

আর এখন খানিকটা অস্পষ্ট লাগলেও ক্ষতি নাই, অংক দেখার সময় বুঝে নিও।

৩। শ্রেণিতে তুল্য রোধের মান আদি সমবায়ের সবচেয়ে বড় রোধের চেয়েও বড় হয়।

৪। সমান্তরাল সমবায়ে বিভবের মান একই থাকে প্রত্যেক রোধ এ। অর্থ কি দাড়াল?  সমান্তরাল থাকা রোধ গুলোর এক প্রান্তে এসে দাড়াল কারেন্ট।  তারপর প্রত্যেকটা ব্রাঞ্চেই  কারেন্ট পাস করার জন্য সমান কাজ করতে হবে ব্যাটারিকে, এই কাজটাই বিভবের মান।

৫। সমান্তরালে যদি বিভবের মান সমানই থাকে, তাহলে ওহমের সূত্র অনুসারে বলতে পারি যে রোধের মধ্য দিয়ে যে কারেন্ট যাবে তা রোধের ব্যাস্তানুপাতিক হবে।

কিংবা যদি ওহমের সূত্রে মনে নাও থাকে ( যদিও এমনটা হওয়ার কথা না) ,  তাহলে ভেবে দেখো একটু। রোধ মানে তো বাধা,  কারেন্টের গতির বিরুদ্ধে বাধা। এবার তুমি যদি বল যে রোধ এর  মান যতই থাকুক,  কারেন্ট পাঠানোর  জন্য তুমি একটা নির্দিষ্ট মানের চেয়ে বেশি কাজ করতে পারবা না।    তাহলে যেখানে রোধ বেশি সে রাস্তায় কারেন্টের মানও কম থাকবে,  তাই না ?  ( যেহেতু বেশি বাধাকে ব্যালান্স করার জন্য তুমি বেশি কাজ করতে পারছো না,  সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই চার্জের ফ্লো টাই কমে যাবে,  অর্থাৎ কারেন্টের মান কমে যাবে)।

তাহলে সমান্তরালে কেন আলাদা রোধে কারেন্টের মান আলাদা হয় সেটা সম্পর্কে  একটু আইডিয়া পাওয়া গেল।

৬। সমান্তরাল সমবায়ের তুল্য রোধের মান সমবায়ের সবচেয়ে ছোট রোধের চেয়েও ছোট হবে ।

৭। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে যে ধর তুমি একটা সার্কিট দেখলা নিচের মত   ,  যেখানে A আর B রোধ এর এক প্রান্ত যুক্ত,  আর অপর প্রান্ত একটু দূরে অবস্থিত । তাহলে অপর প্রান্ত গুলো কি  আলাদা  প্রান্ত ?

 

IMG_20140827_225606

 

মাথায় রাখো,  ছবির 1 আর 2 এই পয়েন্ট গুলার মধ্যে নতুন কোন উপাদান যেমন রোধ  নাই ,  তাই এই ২ টা প্রান্ত আসলে একই প্রান্ত।  তাহলে আমরা সার্কিটটা এভাবেও এঁকে নিতে পারি —

IMG_20140827_225626

 

এই ব্যাপারটাকে,  মানে সার্কিটের এই ১ আর ২ বিন্দু ২টাকে যে নতুন করে আমাদের সুবিধা মত এঁকে নিলাম এটাকে চাইলে circuit redrawing বলতে পারো। তাহলে একটা সার্কিট দেখে আগে আমরা এটার পয়েন্ট গুলাকে এভাবে আলাদা করে পুরো সার্কিটটা আবার এঁকে নিতে পারি,  এটা আমাদের রোধে সমবায় নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে।

 

তুল্য রোধ – প্রথম পাঠ

তুল্য রোধ – ২য় পাঠ

তুল্য রোধ – ২য় পাঠ

আচ্ছা,  শুরুতে স্কুলে পড়তে আমার কিছু ভুল ধারণা ছিল সিরিজ প্যারালাল কম্বিনেশন নিয়ে,   সেগুলা একটু দেখি।

১। সমান্তরাল বা প্যারালাল কানেকশন মানে বুঝি রোধ গুলা আক্ষরিক অর্থেই একটার সাথে আরেকটা সবসময়ই সমান্তরাল ভাবে আঁকা থাকবে  ,  ছবির মত।

 

IMG_20140827_225814

এইরকম চিন্তার পেছনে দায়ী ছিল ৯-১০ এর বইয়ে থাকা সার্কিট গুলার ছবি। কেন জানি না সব গুলা সমান্তরালে থাকা রোধই আঁকা হত প্যারালাল কিছু লাইন বরাবর আর আমি ধরে নিতাম প্যারালাল লাইনে থাকলেই বুঝি প্যারালাল কম্বিনেশন হয়। নতুন এডিশনের একটা বই কিনলাম কিছু দিন আগে,  এর মধ্যেও সেই আগের মতই সমান্তরাল করে আঁকা রোধ গুলো।

সুতরাং আমার সেই কন্সেপ্টটা ভুল ছিল।

কত গুলা রোধ সমান্তরালে আছে কিনা সেটা বুঝার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে যে রোধ গুলার কোন সাধারণ প্রান্ত আছে কিনা সেটা চেক করা।

যেমন নিচের সার্কিটটা। এইখানে রোধ গুলা একটার সাথে আরেকটা কোণ করে আছে ,  আর তাদের অপর প্রান্ত একটা বৃত্তাকার বর্তনীর অংশ হিসেবে আছে। এভাবে দেখে কি বুঝতে পারছো যে এই রোধ গুলা সব সমান্তরালে আছে ?

IMG_20140827_225446

দেখো,  এই ৪টার এক প্রান্ত হচ্ছে বৃত্তের কেন্দ্রে।  আর অন্য প্রান্ত গুলা পরিধির উপরে আছে। কিন্তু দেখ,  পরিধির উপর থাকা প্রান্ত গুলার মধ্যে কিন্তু অন্য কিছু নাই ,  তাই এই প্রান্ত গুলাও আসলে একই প্রান্ত। এবার এই সার্কিটটা দেখো,

IMG_20140827_230326

এরা যে সমান্তরালে আছে   ,  বুঝতে পারছো?

স্কুলের পরীক্ষায় এত হাবিজাবি জিনিস  আসবে না ,  এগুলা শুধু সমান্তরাল এর কন্সেপ্ট সম্পর্কে আইডিয়া নেয়ার জন্য দেখছি।

এইবার এইটা দেখো,

IMG_20140827_230523

এইখানে বাম দিকের গুলো সিরিজ আর মাঝে প্যারালাল।

এইবার এইগুলা দেখো, এইখানের রোধ গুলা কি রকম সমবায়ে আছে চিন্তা করে দেখো।

12

 

শর্ট সার্কিট :

11

 

শর্ট সার্কিট মানে সহজ কথায় সার্কিটের মধ্যে এমন ২টা বিন্দু যাদের মধ্যে কোন সার্কিট এলিমেন্ট মানে রোধ / কোষ / লোড নাই। মানে সিম্পলি,  ২টা পয়েন্ট সরাসরি যুক্ত থাকলে শর্ট সার্কিট।

এইটা নিয়ে যা হইতে পারে তা হচ্ছে  যে প্রশ্নে হয়ত খুব হিজিবিজি কিছু রোধ এর কম্বিনেশন দিল,  কিন্তু কোন এক জায়গায় একটা শর্ট সার্কিট দিয়ে দেয়া আছে। সেইটা আমলে নিলে পুরা সার্কিটের এর হাবিজাবি অনেক গুলা রোধ দেখব যে কাজেই লাগছে না !

13

এইখানে A আর B পয়েন্ট এর মধ্যে ৩টা রোধ আছে। কিন্তু দেখো,  এই ২টা পয়েন্টকে আবার একটা সরাসরি লাইন দিয়ে কানেক্ট করা আছে। মানে শর্ট সার্কিট!  দেখো,  যদি A থেকে B তে যাওয়ার জন্য ঝামেলা মুক্ত – as in রোধ মুক্ত – পথ থাকে তাহলে কারেন্ট কিন্তু সেই পথেই চলে যাবে।  তার মানে A আর B বিন্দুর মধ্যে তুল্য রোধ শুন্য।

এই সার্কিটে তাইলে কি হবে?

14

এইবার এইগুলা করে ফেলতে পারবা না ? A আর B প্রান্তের মধ্যে তুল্য রোধ বের করতে হবে ।

IMG_0497                IMG_0495

 

পারা যাবে মনে হয়।

আচ্ছা , এবার শ্রেণি আর সমান্তরাল সমবায় একসাথে করতে চাইলে কেমন হতে পারে দেখি। এই অংকটা জাহিদুর রহমান স্যারের বই থেকে নেয়া , কলেজের পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্র বই।৩টা রোধ , সবার মান ১ ওহম করে। তাদেরকে কিভাবে সংযুক্ত করলে তুল্য রোধ হবে ২/৩ রোধ ?

৩ টা রোধ , ১ ওহম করে মান। সবাইকে যদি সমান্তরালে যুক্ত করি তাহলে তুল্য রোধ হবে ১/৩ ওহম , তাইনা ? আবার যদি সবাইকে শ্রেণিতে লাগাই তাহলে হবে ৩ ওহম।  কিন্তু কিভাবে লাগালে তুল্য ২/৩ ওহম হতে পারে ?

 

তুল্য রোধ – ২য় পাঠ